সত্তর দশকের মাঝামাঝি নির্মিতি হয়,” শি উইল ফলো ইউ অ্যানি হয়্যার’ নামের একটি সিনেমা। ইংরেজি ভাষার এই ছবির মূল কাহিনি ছিল, এক বিশেষ ধরনের পারফিউমের ঘ্রাণ কৌশলে কোনো নারীকে শুঁকিয়ে দিতে পারলে সেই নারী নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং যে পুরুষ তাকে সেই ঘ্রাণ শুঁকতে দিয়েছে, তাকে অনুসরণ করতে থাকে। নারীটি তার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে এবং তার ইচ্ছানুযায়ী কাজ করে।
কী আশ্চর্য, এত কাল আগের একটি সিনেমার কল্পকাহিনি যেন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে! সতৃতর দশকে নির্মিত চলচ্চিত্রে যে পারফিউমটিই এখন আবিষ্কৃত হয়েছে সম্প্রতি, যার নাম ‘স্কোপোলামিন’।স্কোপোলামিন মূলত একটি সিনথেটিক ড্রাগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ওষুধ তৈরিতে এর ব্যবহার আছে। বমি বমি ভাব, মোশন সিকনেস এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশন পরবর্তী রোগীর জন্য ওষুধে এর ব্যবহার আছে। ধুতরা ফুল থেকে পাওয়া রাসায়নিক এবং আরও কিছু যৌগের সাহায্যে ল্যাবরেটরিতে তৈরি হচ্ছে ভয়ঙ্কর ‘স্কোপোলামিন’। চিকিৎসার জন্য আবিষ্কৃত ও ব্যবহৃত এই গুঁড়া বা তরল রাসায়নিক দ্রব্যের অপব্যবহার বিশ্বজুড়ে এখন এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে ‘ডেভিলস ব্রেথ’ বা ‘শয়তানের নিশ্বাস’ নামে পরিচিতি পেয়েছে এটি। সেই শয়তান এখন নিশ্বাস ফেলছে আমাদের ঘাড়ের ওপর।
স্কোপোলামিন এবং এর মতো আরো বেশ কিছু ওষুধ চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহার করা হয়। স্কোপোলামিন প্রথম দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা জ্ঞিাসাবাদের ক্ষেত্রে ‘ট্রুথ সেরাম’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ এটা যদি ইনজেক্ট করে দেয়া হয় তাহলে সে সত্য কথা বলতে শুরু করে। কারণ তার মগজের উপর নিজস্ব যে নিয়ন্ত্রণ সেটা চলে যায়। সে তখন অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, অন্যের কথা শুনতে থাকে।
”স্কোপোলামিন কথা বলানোর জন্য যখন ব্যবহার করা হয় তখন এটা ট্রুথ সেরাম। যখন স্কোপোলামিন পাউডার ফর্মে নিঃশ্বাসে ব্যবহার করা হয় তখন এটা ‘ডেভিলস ব্রেথ’। আর যখন এটা বমি অথবা মোশন সিকনেসের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা তখন এটা আসলে মেডিসিন হিসেবে ব্যবহার হয়।
প্রথমবারের মতো মেহেরপুর শহরে স্কোপোলামিন ব্যবহারে ভীতিকর পরিস্থিতির শিকার হোন সুভরাজপুরের রেহানা বেগম। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশ দেখতে পায়,রেহানা বেগম কাশারীপাড়া মায়া জুয়েলার্স থেকে স্বর্ণ ক্রয় করে হেঁটে যাওয়ার পথে একজন পেছন থেকে ডেকে কথা বলেন।তার সাথে হেঁটে চলে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে মহিলা কলেজের দিকে। তাঁদের নির্দেশমতো নিজের কানের দুল, গলার চেইন,চুড়ি খুলে দিচ্ছেন, যার মূল্য প্রায় ২৫০০০ হাজার টাকা। কোন আপত্তি ছাড়ায় হাতে স্বেচ্ছায় তুলে দেন রেহেনা বেগম।তিনি ঘোরের মধ্যে এসব করে যাচ্ছিলেন। পরে ঘোর কেটে গেলে বুঝতে পারেন তিনি নিঃস্ব। অপরাধীরা ফুঁ দিয়ে একধরনের পাউডার তাঁর নাকের কাছে ছড়িয়ে দিয়েছিল, সেই পাউডার তাঁর নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি এবং অপরাধীদের কথামতো কাজ করতে থাকেন।
অপরাধীরা অপরাধের ধরন দিন দিন পাল্টাচ্ছে। মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি ইত্যাদি নানা নামের অপরাধী চক্র সক্রিয় ছিল এত দিন।শয়তানের নিশ্বাস এখন ছিনতাইকারীদের নতুন হাতিয়ার।
এসব বিপদ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে নিজে সতর্ক থাকা এবং এ ব্যাপারে পরিবারের লোকজনকে সতর্ক রাখা। অপরিচিত কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো কাগজ, খাদ্য বা পানীয় ইত্যাদি গ্রহণ না করা, এমনকি টাকাপয়সা হাতে নেওয়ার সময় নাক-মুখ থেকে দূরে রাখা। ভ্রমণকালীন সময়ে গণপরিবহন বা বিভিন্ন পর্যটন স্পটে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বেশি। এ ক্ষেত্রে সদ্য পরিচিত লোকজনের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা গড়ে না তোলাই শ্রেয়। সর্বোপরি কোভিডের সময় যে অভ্যাসগুলো আমরা রপ্ত করেছিলাম, সেই মাস্ক পরা, নাকে-মুখে হাত না দেওয়া প্রভৃতি অভ্যাস ‘শয়তানের নিশ্বাস’ থেকে বাঁচার জন্য কার্যকর হতে পারে।
লেখক: কবি ও সাহিত্যিক